নানা জটিলতায় ৭ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ১০ তলার একাডেমিক ভবন-৩ এবং কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ভবনের নির্মাণকাজ। সময় অনুযায়ী কাজ শেষ না হওয়ায় ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে ভবনটি। মরিচা ও শ্যাওলায় নষ্ট হচ্ছে নির্মাণসামগ্রী। শ্রেণীকক্ষ সংকটে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ফলে রুমের সংকটে ক্লাস করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ৩৩ টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের।
সরজমিন দেখা গেছে, লতা-পাতায় ঢেকে আছে নির্মাণাধীন ভবন। লোহার রডে মরিচা ধরেছে, ইটের গাঁথুনিতে শেওলা জমেছে। দেখলে মনে হবে এটি পুরনো কোনো পরিত্যক্ত ভবন। দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকায় ভবনের অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে শ্রেণীকক্ষ সংকটে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হচ্ছে নন-একাডেমিক ভবনে। বাধ্য হয়ে নির্মাণাধীন ভবনেও ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। ক্লাসের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে গবেষণাকাজও। শিক্ষকরাও তাদের গবেষণা কাজে প্রয়োজনীয় পরিবেশ পাচ্ছে না।
একধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ছয়-সাত বছর ধরে শ্রেণীকক্ষ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষ ও গবেষণাগারের জন্য বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেও কোনো ফল পায়নি। একাডেমিক ভবনের বাইরে প্রশাসনিক, বিএনসিসি, লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম ভবনে গিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে। বেশির ভাগ সময় ক্লাসের জন্য বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় দেখা যায়। কোনো কোনো সময় দাঁড়িয়ে থেকেও ক্লাস না করে ফিরে যেতে হয় তাদের। এতে নির্দিষ্ট সময় পরীক্ষাও শেষ হয় না। একাডেমিক পরিবেশে ক্লাস করতে না পেরে হতাশ তারা।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সাময়িকভাবে ক্লাসরুমের সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাডেমিক ভবন-৩-এর দ্বিতীয় তলায় কয়েকটি রুম করে সেখানে কয়েকটি বিভাগকে বরাদ্দ দিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় প্রভোস্ট বিল্ডিং ও বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলেও ক্লাসরুম বরাদ্দ দেওয়া হয় কয়েকটি বিভাগকে।
শুধু তা-ই নয়, নোবিপ্রবি সাধারণ শিক্ষক সমিতি, নোবিপ্রবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বসা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো রুম নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাহত হচ্ছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এ অবস্থায় নোবিপ্রবির স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে একাডেমিক ভবন-৩-এর কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছে শিক্ষক -শিক্ষার্থীরা।
ওশানোগ্রাফি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদুল ইসলাম রাফি বলেন, ” নোবিপ্রবি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মৌলিক সুবিধা এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ভবন-৩ এর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকটে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, হল সংকট, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার অভাব এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে স্থবিরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নানা সময়ে অভিযোগ করলেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসুদ কাইয়ুম বলেন, “একাডেমিক-৩ ভবনটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও ভবনটি আলোর মুখ দেখেনি, আর এখনো তা অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে আমাদের এক রুমে ৪-৫ জন শিক্ষককে বসতে হচ্ছে। এমনকি অধ্যাপকরা নিজস্ব কক্ষ না পেয়ে তিনজন পর্যন্ত একই রুমে অফিস করছেন।
তিনি আরো বলেন, অনেক বিভাগের চেয়ারম্যানেরও আলাদা রুম নেই। এতে শিক্ষকদের গবেষণার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুধু এই ভবন সমস্যার কারণেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি সমাধানে চেষ্টা করছে, আশা করা যায় দ্রুতই এর সমাধান হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বলছে, নোবিপ্রবির ১০ তলা একাডেমিক ভবন ও কেন্দ্রীয় গবেষণাগার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। চুক্তি অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা ২০২১ সালের মাঝামাঝি। ভবনটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যার মধ্যে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে ৩১ কোটি টাকারও বেশি। যৌথভাবে জিকেবিএল ও বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দুটি কাজটি করছে। অভিযোগ ওঠে, কভিডের দোহাই দিয়ে ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত কচ্ছপ গতিতে কাজ করে তারা। মার্চ-পরবর্তী কাজ রেখেই অনেকটা গা-ঢাকা দেয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন। আবার অর্থ পাচার ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে গ্রেফতার হন জিকে বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী জিকে শামিম। একপর্যায়ে পুরোই বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে অফিশিয়ালি চুক্তি বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিনেও ভবন নির্মাণ না হওয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খামখেয়ালিপনাকেও দুষছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নোবিপ্রবির অসম্পূর্ণ একাডেমিক ভবন ৩ এর অবশিষ্ট কাজ, নোবিপ্রবি স্কুল ও কলেজ ভবন তৈরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণার যন্ত্রপাতি ক্রয়, ২ টি আবাসিক হল নির্মাণ প্রকল্প বাবত ৩৪২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পিএসসি মিটিংয়ের অপেক্ষায় আছে।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, একাডেমিক ভবন-৩ এর জন্য ৩৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে কিছু প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা এসেছিল, আমরা সেগুলোর উত্তর ইতোমধ্যেই জমা দিয়েছি। এখন আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পিএসসি মিটিংয়ের অপেক্ষায় আছি।
এ সময় তিনি আরো বলেন, প্রকল্পটি জমা দেওয়ার সময় ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ সম্পন্ন করা হয়নি। এজন্য প্রায় দেড় মাস অতিরিক্ত সময় লেগেছে। পরবর্তীতে আমরা ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মিটিং শেষে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছি।
আমরা আশা করছি, এই সপ্তাহেই পিএসসি মিটিং অনুষ্ঠিত হলে, পরবর্তী একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হবে। একনেক সভায় প্রকল্পটি পাস হলেই আমরা নির্মাণকাজসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করব। আমাদের লক্ষ্য, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অথবা অক্টোবর মাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন–৩ এর নির্মাণকাজ শুরু করা।”